Table of Content

Shuja Rasheed
NA
NA
17 articles

জামাই

লেখক: শুজা রশীদ Category: ছোট গল্প (Short Story) Edition: Dhaboman - Eid 2018

করিমুন্নেছার কত বয়েস কেউ সঠিক জানে না। হতে পারে আশি, হতে পারে পঁচাশি। তার যখন জন্ম হয়েছিল তখন দিন তারিখ কেউ লিখে রাখত না। একেবারে ঠাং ঠ্যাংগা শরীর, কিন্তু দৃষ্টি এখনও তীক্ষ্ণ, শ্রবণশক্তি প্রখর, হাঁটতে চলতে কোন সমস্যা নেই। অসুবিধার মধ্যে একটাই, মাঝে মাঝে কিছু কিছু জিনিষ ভুলে যান। মানুষের নাম ধাম, চেহার্‌ পরিচয় নিয়ে সবচেয়ে বেশী সমস্যা হয়। টরন্টোতে মেয়ের বাসায় বেড়াতে এসে তার প্রধান সমস্যা দেখা দিল মধ্যবয়েসী লোকটাকে নিয়ে। তার মেয়ে রহিমাতুন্নেছা, বা রীমা, মেয়ে ভালো। দু’টি নাতনী। একটা ভালো, আরেকটা একটু বিটলা। কিন্তু সেটাও মেনে নেয়া যায়। শুধু এই লোকটাকে নিয়ে তার মনে বিশেষ জটিলতা তৈরী হয়েছে। মানুষ হিসাবে খুবই চমৎকার, তাকে ভীষণ আদর যত্ন করে, কিছু চাইবার আগেই এনে হাজির করে, কিছু খাইতে চাইলে ছুটে দোকানে গিয়ে নিয়ে আসে – সে সব ভালো। কিন্তু তার মেয়ের সাথে এই বাসায় লোকটা কেন থাকছে? এটা কি ভালো দেখায়? মানুষ কি বলবে? কয়েকটা দিন খুব দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে কাটিয়ে শেষে একদিন মেয়েকে শক্ত করে ধরলেন করিমুন্নেছা। সকালে লোকটা কাজে চলে যায়। তক্কে তক্কে ছিলেন। গাড়ী নিয়ে চলে যাবার সাথে সাথে রান্নাঘরে গিয়ে মেয়ের হাত চেপে ধরলেন।

“রীমা, ঐ লোকটা কে?”

“কোন লোকটা?” রীমা বুঝেও না বোঝার ভান করে।

“ঐ যে, সুন্দর মত। এই বাড়ীতে থাকে। মানুষটা ভালো। যা চাই তাই দেয়। কিন্তু চেনা চেনা লাগে না। কে সে?”

“তুমি তাকে কি বলে ডাক?”

“জামাই”।

“জামাই বলে কেন ডাক?”

“তোর ভাইয়েরা ডাকে, তাই আমিও ডাকি। কে লোকটা?”

“ও তো আমার বর, মা।”

করিমুন্নেছার দুই চোখ কপালে উঠল। “বল কি? তুমি বিয়ে করছ? কবে?”

“সে তো অনেক আগের কথা মা। তুমি আর তোমার স্বামী, আমার বাবা, আমাকে বিয়ে দিয়েছিলে, মনে নেই?”

“তাই নাকি? আমার স্বামী কই?”

“বাবা তো বেহেশতে চলে গেছে।“

করিমুন্নেছা সন্দিহান দৃষ্টিতে কিছুক্ষন মেয়েকে পর্যবেক্ষণ করলেন। মুচকি মুচকি হাসছে মেয়েটা। তার মনে হল কিছু একটা লুকাচ্ছে। “তুমি কেন খামাখা তাকে দোষ দিচ্ছ? তুমি নিজে নিজে এই লোকটাকে বিয়ে করেছ, ঠিক কিনা? এমনকি আমাকেও বল নি। ছিঃ ছিঃ। আমি না তোমার মা?”

করিমুন্নেছার দুই চোখ অশ্রুতে টই টম্বুর হয়ে যায়। এতো ভালোবেসে এই মেয়েটাকে তিনি বড় করেছেন আর সে এই রকম একটা কাজ করল তার সাথে? রীমা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তিনি শুনলেন না। দ্রুত নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। এখন তিনি বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষন একাকী কাঁদবেন। মেয়েটা তার মনে অনেক দুঃখ দিয়েছে। ছিঃ ছিঃ।

 

 

বয়েস হয়েছে, ফলে বিছানায় একটু শুলেই চোখ জড়িয়ে যায়। মনে হয় একটু তন্দ্রা মত এসেছিল, দরজায় খটাখট শব্দ শুনে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলেন করিমুন্নেছা।  এতো জোরে কেউ দরজা ধাক্কা দেয়? নিশ্চয় ছোট মেয়েটা। এমন বদমাশ মেয়ে। সারাক্ষণ তার পেছনে লেগে আছে। এক ফোঁটা দেখতে পারে না তাকে। নানী এই করেছে, নানী ঐ করেছে – সব কিছু নানীর দোষ। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, দরজা খুলবেনও না, কোন জবাবও দেবেন না, খানিক্ষন ধাক্কা ধাক্কি করে চলে যাবে। গেল না। ত্যাঁদড় মেয়ে, কেন যাবে? ধাক্কা ধাক্কিতে যখন কাজ হল না তখন নিজেই দরজার তালা খুলে ফেলল। ফালতু তালা লাগিয়েছে এরা দরজায়। বাইরে থেকে খোলা যায়। করিমুন্নেছা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে ভান করতে লাগলেন তিনি ঘুমাচ্ছেন। ভেতরে ঢুকে তাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে মেয়েটা বিড়বিড়িয়ে বলল, “ঢং। মোটেই ঘুমাচ্ছ না। আমি জানি। আমার নীল পাথরের কানের দুলটা পাচ্ছি না। নানী, তুমি কালকেই ওটা আমার হাত থেকে নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিলে। ঠিক করে বল, তুমি নিয়েছ?”

করিমুন্নেছা আর ঘুমের ভান করে থাকতে পারলেন না। এই দুধের মেয়েটা তাকে চোর বলছে? তিনি রুক্ষ কন্ঠে বললেন, “তোমার জিনিষে আমি হাত দেই না। পচা মেয়ে! আমাকে জ্বালাবে না। রীমা! রীমা! এই মেয়েটাকে যাতে বল।”

রীমা এবং তার বড় মেয়ে দু’জনাই দৌড়ে এল। বড় মেয়েটা ভালো। ইউনিভার্সিটিতে যায়। আজ মনে হয় ক্লাশ নেই। সকাল থেকে ঘুমাচ্ছে। সে করিমুন্নেছাকে খুব দেখে শুনে রাখে। ছোটটার মত না। কিন্তু তারা এসে পৌঁছানোর আগেই আরেক কান্ড হয়ে গেল। করিমুন্নেছার বালিশের নীচে খুঁজতে গিয়ে কানের দুল জোড়া পেয়ে গেল পুচকী মেয়েটা। করিমুন্নেছার দুই চোখ কপালে উঠল। কত বড় দুষ্ট মেয়ে! তাকে সবার কাছে ছোট করবার জন্য নিজেই ওগুলো তার বালিশের নীচে লুকিয়ে রেখে এখন এসে হম্বি তম্বি করছে। মা এবং বোন আসতে হাতের দুল জোড়া বাতাসে নাচিয়ে, চোখ কান বাঁকিয়ে, মেয়েটা রাগী গলায় যাচ্ছে তাই সব কথা বলছে। “দেখেছ তোমরা, আমার কানের দুল নানীর বালিশের নীচে ছিল। সব সময় শুধু আমার ঘরে যায় আর আমার সুন্দর সুন্দর জিনিষগুলো চুরি করে নিয়ে আসে। ফেরত চাইলে বলবে, নেই নি। আমার কিন্তু খুব রাগ হয়ে যাচ্ছে।”

করিমুন্নেছা আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। “মিথ্যা কথা। আমি ওর জিনিষ কক্ষন নেই না। ও নিজেই ঐটা আমার বালিশের নীচে রেখেছে। রীমা, বিশ্বাস কর।”

রীমা ছোট মেয়ের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাল। “তুমি নানীর সাথে সব সময় এমন কর কেন? সে ভুলে যায়। তোমার জিনিষ নিয়ে সে কি করবে?”

মেয়েটিও হারবার পাত্রী নয়। “কিছু করবে না তো নেয় কেন? ও একটা চোর! আমার চুরি নেয়, ছবির বই নেয়, সুন্দর কলমগুলা নেয়, আংটি নেয় – ফেরত চাইলে বলে নেই নাই।”

করিমুন্নেছা হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললেন। “আমাকে চোর বলল? রীমা, তুমি কিছু বলবা না ওকে?”

রীমা ছোট মেয়েকে টেনে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে যায়। বকা বকি করে। বড় মেয়েটা করিমুন্নেছার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম করে কথা বলে। ভালো লাগে। এই মেয়েটা অনেক লক্ষ্মী। একটু পরে শান্ত হন তিনি। মনে মনে ঠিক করলেন ঐ মেয়েটাকে চোখে চোখে রাখতে হবে। যেন আবার তার ঘরে ঢুকে কিছু লুকিয়ে না রেখে যেতে পারে। কি কুটিল মন ঐটুকু মেয়ের! আর কি হিংসুটে! রীমা টা তার সাথে রাতে এসে একটু শুলেই হল, এসে জোর করে তাকে নিয়ে যাবে। তার নাকি রাতে একা শুতে ভয় লাগে। শুধু করিমুন্নেছার পাশে এসে শুলেই তোমার ভয় লাগে। অন্যদিন তো লাগে না। রীমাটা এসে মায়ের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেবে তারও উপায় নেই। এসে বলবে তারও নাকি মাথায় ব্যাথা করছে। রীমাকে জোর করবে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবার জন্য। খুব রাগ হয় করিমুন্নেছার। এই মেয়েটা একেবার দুষ্ট একটা সৎ বোনের মত, তার কোন ভালো দেখতে পারে না। 

 

রাতে লোকটা কাজ থেকে ফিরে এসে সবাইকে নিয়ে খাওয়া দাওয়া করে সোফায় বসে টেলিভিশন দেখছে। করিমুন্নেছা সবার সাথে খান না। তিনি আগেই বিছানায় চলে যান তাই সন্ধ্যা হলেই খেয়ে নেন। ছোট একটা ঘুম দিয়ে টেলিভিশন দেখতে এলেন। বাংলা নাটক হলে দেখেন। বিশেষ করে গ্রামের নাটক। টেলিভিশন রুমে এসে যা দেখলেন তাতে তার মেজাজটা খারাপ হল। রীমা ঐ লোকটার পাশে গা ঘেঁষে বসে টেলিভিশন দেখছে। তার দিকে ফিরতেই তিনি চোখ গরম করে চড় দেখালেন। রীমা উঠে এলো। ফিসফিসিয়ে বলল, “কি হয়েছে মা?”

“তুমি ঐ লোকটার পাশে বসে আছো কেন?”

“ও তো আমার বর।”

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ মা। আমাদের দুইটা বাচ্চাও আছে।”

 

করিমুন্নেছার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। “ছিঃ ছিঃ। কি ধরণের মেয়ে তুমি? এতো খারাপ হয়ে গেছ? ঐ লোকটার সাথে বাচ্চাও নিয়ে নিয়েছ? চিন্তা করতে কষ্ট হচ্ছে। তোমাকে কি আমি এইরকম শিক্ষা দিয়ে বড় করেছিলাম?”

করিমুন্নেছা খুবই রাগ করে ছুটে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। এই মেয়েটা একেবারেই বখে গেছে। এই বাড়ীতে তার আর বোধহয় বেশীদিন থাকা হবে না। কালকেই ছেলেকে ফোন করবেন, তাক যেন আবার মন্ট্রিয়লে তার ছোট ছেলের বাসায় রেখে আসে। সেই বাড়ীতেও তিনি সবাইকে ভালো চেনেন না কিন্তু অবস্থা এতো খারাপ না।

 

একটু ঝিম মত এসেছিল। দরজায় খুব আলতো খুঁট খাট শব্দ। নিশ্চয় ঐ লোকটা। খুব ভদ্র স্বভাব।

“কে?”

“আমি জামাই, মা।” খুব মোলায়েম গলায় কথা বলে লোকটা। “ভেতরে আসবো?”

“আসো। আসো।”

করিমুন্নেছা তাড়াতাড়ি উঠে বসে শাড়িটা ঠিক ঠাক করে নেন। জামাই ভেতরে ঢুকে খুব মিষ্টি একটা হাসি দিল।

“মা, গাড়ীতে করে ঘুরতে যাবেন?”

গাড়ীতে করে ঘুরতে করিমুন্নেছার খুব ভালো লাগে। জামাই তাকে প্রায়ই রাতে কাজ থেকে ফিরে ঘুরাতে নিয়ে যায়। আর কেউ না। ছোট মেয়েটা তো নাইই। দুষ্ট!

“আমাকে তিলের খাজা কিনে দেবে, জামাই?”

“কোনটা? গোল গোল না লম্বা লম্বা?”

“একটা হলেই হয়।”

“দেব। চলেন।”

করিমুন্নেছা ঝট করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। রীমা আর বড় মেয়েটা হাসি মুখে তার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি মেয়ের দিকে তাকালেন। “যাবো?”

“যাও মা? তিলের খাজা খেয়ে আসো। আমাদের জন্য একটু নিয়ে এসো।”

“আনবো, আনবো। জামাই, চল।”

চলন্ত গাড়ীতে চুপচাপ বসে থেকে চারদিকের রাস্তা ঘাট, ঘর বাড়ী, গাড়ী-টাড়ি দেখতে ভালো লাগে করিমুন্নেছার। কেমন যেন মায়াবী- মায়াবী মনে হয় সব কিছু। অনেক সময় দুলুনীতে ঘুমও এসে যায়।

“মা, ঠিক আছেন তো?” জামাই মৃদু গলায় জানতে চায়।

“ঠিক আছি।” একটু পরে যোগ করলেন, “জামাই। তুমি লোকটা ভালো। আমার মেয়েটা ভালো না। একটা অপরিচিত লোকের সাথে থাকে। কি করব বল? আমি তো বুড়া হয়ে গেছি। কিন্তু মেয়েটার মন ভালো। তুমি ওকে একটু দেখে শুনে রেখ।”