Table of Content

Jashim Mollik
NA
NA
3 articles

লুৎফা

লেখক: জসীম মল্লিক Category: ছোট গল্প (Short Story) Edition: Dhaboman - Eid 2018

১.

এখন ডিসম্বেরের শুরু। যখন তখন ঠান্ডা আর বরফে মাখামাখি হবে এটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতির সৌন্দর্য্য বলে কিছু নেই। গাছের পাতারা ঝড়ে গেছে। সবুজ হারিয়ে গেছে। এখন মুন্ডিত গাছপালা ঠাঁয় দাড়িয়ে আছে। যেনো এক একটা মূর্তি। যেনো কেনোদিন এতে প্রান ছিল না। সবুজ ছিল না। অথচ এই তো সেদিনই কী সবুজই না ছিল চারদিক। আহা মন জুড়ায়। চোখ ধাঁধায়। এরপর যখন পাতাদের বর্ণ পরিবর্তন হতে শুরু হলো তখন কী মোহনীয় হয়ে উঠেছিল প্রকৃতি। বহু বর্নে সেজেছিল চারদিক। হলুদ, গোলাপী, লাল কত না বর্ন আর বিভায় ভরা ছিল। পতাদের ঝরে পড়ার আগে এরকম সাজ সাজেছিল। সেসব নেই এখন। এসবের জন্য আবার দীর্ঘ অপে¶ করতে হবে।

পাকির্ং লটে গাড়ি পার্ক করে তাপস বের হলো। এত¶ন গাড়ির মধ্যে হীটিং চলছিল। তাপস গাড়িতে বেশী হীটিং চালাতে পারে না। মাথা ধরে যায়। সবসময় একটু ঠান্ডা বাতাস দিয়ে রাখে। বের হওয়ার সাথে সাথে তীব্র বাতাস আর  ঠান্ডা আকড়ে ধরলো ওকে। কিন্তু ভাল লাগছে। খুউব ভাল লাগছে।  গরম একদম অপছন্দ তাপসের।

তাপস টীম হর্টনের মধ্যে ঢুকে পরলো। আহ বেশ আরাম লাগছে। উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে চারদিকে। গম গম করছে মানুষ ভিতরে। কফির জন্য লম্বা লাইন। তাপস কোনার দিকের একটা টিবিল নিয়ে বসল। বেস আরামদায়ক। গদিওয়ালা। এখানে চারজন বসা যায় দুদিকে। কিন্তু তাপস একাই পুরোটা দখল করে বসল। কারো কিছু বলার নাই। পাশের টেবিলেই এক তরুনী একটা চেয়ারের উপর পা তুলে সেল ফোনে টে·ট লিখছে আর খিল খিল করে হাসছে। আশে পাশের কাউকে কেয়ার করছে না।

সেটা পড়শুদিনের কথা। সন্ধ্যার দিকে একটু হালকা বরফও পড়েছিল। অল্প সময়ের জন্য। সেদিন ছিল বুধবার। বুধবার কোনো বিশেষ দিন না। কোনো দিক থেকেই না। তবে সেদিন প্রচন্ড বৃষ্টি ছিল। ধর্ষকামী প্রমাদের মতো ছিল বৃষ্টির রিরংসা। আর ছিল কনে কনে ঠান্ডা বাতাস। আটলান্টিক থেকে ধেয়ে আসছিল বাতাসের তীব্রতা। তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল শুন্যের নীচে। তাপসের আগে থেকে জানা ছিল না যে আজ ফ্র্রীজিং রেইন হবে। বৃষ্টির পানি জমে বরফ হয়ে যাচ্ছিল। পথ ঘাট হয়ে পরছিল বিপদজনক, পিচ্ছিল। গাড়ির ওয়াইপারে চিক চিক বরফ জমে আছে। কাঁচের মতো। পানি ঝড়ে পড়ার আগেই জমে যাচ্ছে। বরফ খন্ডের মতো ঝুলে আছে।

তাপসইতো একবার প্রায় উল্টে পড়ে যেতে নিয়েছিল। এমন পিচ্ছিল হয়ে ছিল সবকিছু। কোনোমতে নিজেকে সামলিয়েছে। বুধবার কেনোদিক থেকেই বিশেষ দিন না হলেও তাপসের কাছে পরশু দিনটা কিন্তু বিশেষ দিনই ছিল। অফিস থেকে তাপস ফেরার পথে এই টীম হর্টনে ঢুকবেই। এটা একটা নিয়মের মতো হয়ে গেছে। আরাম করে কফিতে চুমুক দিয়েছে এই সময় একটা মেসেজ আসলো সেল ফোনে। চমৎকার বিশুদ্ধ ইংরেজীতে লিখল, ’চিনতে পারছেন!’

ব্যস এই টুকুই। নাম লুৎফা। নামটা চেনা লাগলো।  একবার এক অনুষ্ঠানে পরিচয় হয়েছিল। কথাও হয়েছিল। কিন্তু কবে ঠিক মনে পরছে না। ফোন নম্বর দেয়া নেয়াও হয়েছিল! তাপসের মনে পরলো কোথায় পরিচয় হয়েছিল।

তাপস মেসেজর উত্তর লিখল ’হু চিনেছি।’

লুতফাকে মনে না থাকার কেনো কারন নাই। কিন্তু তাপস সাথে সাথে লুৎফাকে রিপ্লাই করলো না।

আজকে  আবার টিমহর্টনে আসল। আজ লুৎফা আসবে। সেদিনের দেখা হওয়ার সাথে আজকের দেখা হওয়ার তফাৎ আছে। সেদিন জাষ্ট একটা অনুষ্ঠানে কথা হয়েছ্।ে সামান্য কথাই মেয়েটি তাপসকে আকৃষ্ট করেছে। ময়েটিও তাপসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকতে পারে। আজকে দুপুরে তাপস অফিস থেকে ফোন করেছিল। তাপস কেনো ভনিতা না করে সরাসরি বলল, মেসেজের জন্য ধন্যবাদ।

ও প্রান্তে লুৎফার কন্ঠে খুশী ঝরে পরলো। ইউ আর ভেরি ওয়লকাম।

তাপস বলল, মনে যে রেখেছেন সেটাই অনেক।

মনে না রাখার মতো কি কিছু!

কত জনের সাথেইতো কতজনের দেখা হয় কথা হয়, ক’জনই বা আর মনে রাখে!

তা ঠিক। যন্ত্র সভ্যতা মানুষকে মানুষের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

তাই কী লুৎফা! আমার তা মনে হয় না। আসল কথা হচ্ছে মনের মিল হওয়া। চমৎকার বোঝাপড়া না হলে সম্পর্ক এগুতে চায় না।

তারপরও সম্পর্ক গড়া তো এত সহজ না। সামান্য সম্পর্ক গড়তেও মানুষ হিম সিম খায়।

কেনো জানেন?

কেনো?

বিশ্বাসের অভাব, আস্থার সঙ্কট।

রাইট। কিন্তু সেটা নিশ্চিত করাইতো এক কঠিন কাজ।

মোটেও কঠিন কিছু না। নির্ভর করে সুন্দর মানুসিকতার উপর। অনেষ্টির উপর।

ট্রু।

কী করছেন আজকে অফিসের পর?

তেমন কিছু না!

দেখা হবে?

হু। হতে পারে।

ওকে। ফাইন।

তাপস ঠিকানা বলল, লেয়ার্ড ড্রাইভ।

২.

তাপস আগে ভাগেই এসে বসে আছে। লুৎফার একটু দেরী হবে। ওর অফিস ছটা পর্যন্ত। এই সময় ছটা মানে রাত। তাপস অপে¶া করছে। লুৎফা আসলেই কফির অর্ডার করবে। সেদিন লুৎফার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল কবির। কবিরের পরিচিত লুৎফা। কিন্তু তাপস কবিরের কাছ থেকে বেশী কিছু জানতে চায় নি। একটু¶ন কথা বলেই লুৎফাকে বেশ অন্য রকম লেগেছিল। একটু ডিফারেন্ট চিন্তা ভাবনার। অন্য আর দশাটা মেয়ের মতো না। কথাবার্তায়  চৌকশ ও স্মার্ট। মেইনস্ট্রীমের জব করে।

কেনো যে লুৎফা তাপসকে মেসেজ পাঠালো! তাপস কখনও ভাবেনি আর দেখা হবে। ফোন নম্বর সেদিন লুৎফাই চেয়েছিল। তাপসও কি মনে মনে ভাবেনি যে যোগাযোগ থাকুক! ভেবেছিল। কিন্তু কিভাবে ফোন নম্বর চায়! সেই কাজটা লুৎফাই করে দিয়েছে। থ্যাংকস লুৎফা। ফোন নম্বর থাকলেও তাপস ফোন করেনি। অপে¶া করেছে। লুৎফার সময় হলে করবে। সেই লুৎফা অপে¶ার অবসান ঘটিয়ে মেসেজ দিয়েছে, ’ চিনতে পরছেন!’ আহ্ কি সুইট! সাধারণতঃ মেয়েরা চায় ছেলেরা আগ বাড়িয়ে সব করবে। লুৎফা সেরকম না। কথা বার্তায় কেনো মেয়েলিপনা নাই।

ছটা বেজে গেছে। তাপস দরজার দিকে বার বার তাকাচ্ছে। লুৎফর চেহোরা ভালো মতোই মনে আছে। দেখা মাত্রই চিনবে। মাত্র মাস দুয়েক আগে দেখা হয়েছিল। আজ দেখা হলে লুৎফার সম্পর্কে জেনে নেবে। একটু একটু জানার মধ্যে কত আনন্দ। তাপস সম্পর্কেও জানবে লুৎফা। একটু সুন্দর রিলেশনশিপ কত কি দিতে পার মানুষকে। সুখ দিতে পারে, সংসার দিতে পারে, সন্তান দিতে পারে। আবার সম্পর্ক যদি ঠাক ঠাক মতো না গড়ে উঠে বা ভুল সম্পর্ক হয় তাহলে সবকিছুই উল্টে যেতে পারে। তিক্ততায় ভরে যেতে পারে জীবন।

অনেক কিছু ভাবছে তাপস। একটু এ্যাডভান্স ভাবনা আর কি। হাতের ফোনটা নিয়ে খেলা করছে। আসলে অপে¶ার একটা উত্তেজনাতো আছেই। লুৎফা ডিরেক্ট এখানে চলে আসবে।

দরজা খুলে একজন ঢুকছে। হ্যাঁ হ্যাঁ এই মেয়েটাইতো লুৎফা। ওয়াও! কী গর্জিয়াস লাগছে! তাপসের বুকের মধ্যে একটা ব্যাঙ লাফ মারলো! 

লুৎফার টাইপটাই একটু অন্য রকম। আপাত তাকে আর দশটা মেয়ের মতোই মনে হবে; যার সুন্দর দুটো চোখ আছে, মাথা ভরা চুল আছে, ঘন ভ্রæ আছে, চমৎকার হাসি আছে, আর আছে সুডৌল হাত পা। তারপরও কি লুৎফা আর সবার মতো! লুৎতফা কি আলাদা নয়! লুৎফাকে কিন্তু কেউ আলাদা করতে পারে না। লুৎফা সেটা জানে। সবাই ভাবে লুৎফা এভারেজ কারন লুৎফা কখনও কাউকে বুঝতে দেয় না যে তাকে সবাই যেমন ভাবে সে মোটেও সেরকম না। সে কখনও সাবার ভাবনার মতো হবে না। মরে গেলেও না। এমনকি লুৎফার বাবা মা যেমন ওকে জানে লুৎফা সেরকমও না। ওকে কি ওর বাবা মাই জানে! লুৎফা মনে মনে হাসে। নিজেই নিজেকে বলে আমাকে কেউ জানে না। কেউ না। বোকা মানুষরা ভাবে তুমি আমার, তোমাকে জয় করা কত সহজ!

এমন না যে লুৎফা খুউব জটিল করে নিজেকে উপস্থাপন করে। মোটেই তা না। লুৎফার সাথে কথা বললে, লুৎফার সাথে মিশলে যে কেউ বলবে বাহ্ মেয়েটা তো চমৎকার। সহজ সরল, পানির মতো। যে কোনো পুরুষ একবার কথা বললে তাকে নিয়ে ভাববেই। ভেবে ভেবে সারা  হবে। কল্পনার জাল বুনবে। অবশেষে বুঝবে, খুউব নিভৃতে নিজে নিজেই বুঝে যাবে লুৎফা তাদের কারো নয়।

বাড়িতে লুৎফা একা। গন গনে পুরুষের মতো দুপুর, নির্জন বাড়ি। বাবা মা গেছে বাইরে। আর আজ অন্যরকম এক দামাল হাওয়া। আজ খুউব তার কথা মনে হচ্ছে। সে কিন্তু  খুব সাধারন একজন মানুষ। তারপরও প্রথম দেখায় একটা আলাদা ব্যঞ্জনা নিয়ে লুৎফার সামনে এসেছিল। কিযে ছিল তার চোখে! খুউব মায়াভরা দুটি চোখ। এরকম চোখ কিন্তু খুউব মনে থাকে। ভোলা যায় না। হ্যাঁ হ্যাঁ কবির ভাই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।

ফাঁকা বাড়িটায় লুৎফা একা। ইস্ এ সময় যদি সে সামনে এসে দাঁড়ায়! মাগো ভাবতেই গা সির সির করে উঠে! কেমন মানুষ সে? একদিনই দেখা হয়েছে! ভালো করে কি মনে আছে লুৎফার! একদম পুর“ষ মানুষের মতোই। তবে একটু যেনো আনমনা, ভুলো মন, একটু পাগলাটে। হোক। তাতে কেনো ¶তি নেই। খুব ঝক ঝকে সুন্দর মসৃন দাঁত আর হাসিটা খুব সুন্দর। সে কারও মতো নয়। অন্যরকম। এই অন্যরকমটা রোজ বদলে যায়।

এই নির্জন দুপুরে সেই আবছা পুরুষের কথা খুব মনে আসে লুৎফার। তার বন্ধুরা প্রায়ই সে· নিয়ে কথা বলে। লুৎফার ও ব্যপারটা ভাবতে ভাল লাগে না। শরীরের গ্যাদগ্যাদে ব্যপারটাতো আছেই কিন্তু ওটাই সব নয়। লুৎফা ভাবে ভাবের পুরুষের কথা শরীরের পুরুষ নয়।

লুৎফা জানে আবেগ জিনিসটা একটা ওভারফ্লো। তাতে কেউ কাউকে ঠিকমতো এ্যাসেস করতে পারে না। পরে মিস ক্যালকুলেশনের ফল ভোগ করে। তাই সে শুধু লিখল, ’চিনতে পারছেন!’

এর রিপ্লাই নিয়ে লুৎফা ভাবলো না। ছুটর দিন ছিল। কেউ বাড়িতে ছিল না। কেউ বলতে বাবা মা। লুৎফা একাই। তবে তাৎ¶নিক রিপ্লাই এসেছে, ’হু চিনেছি।’

বাহ মানুষটা তো বেশ এটিকেট জানে! ব্যস একটু ভেবেই খ্াš— দিল লুৎফা। তারপর লুৎফার দিন যেতে থাকে ব্য¯—তায়। লুৎফার বয়স এখন ছাব্বিশ। বাবা মা তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা করলেও লুৎফার মতামতের বাইরে যাবার সাহস তাদের নেই। লুৎফা খুব অল্প বয়স থেকেই নিজেকে আলাদা একটা ¯^ত্ত¡ায় পরিনত করেছে। যারা লু“ৎফাকে জানে তাদের ওকে নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। বিয়ে নিয়ে কেনো তাড়াহুড়ো নেই ওর। খুব জরুরীও মনে হয় না। এমনকি লুৎফার কোনো প্রেম ভালোবাসাও হয়নি কারো সাথে আজও। প্রেম ভালোবাসা ব্যপারটার ব্যঞ্জনাই ওর কাছে আলাদা।  ভিন্ন এক মাত্রা বহন করে। যারা প্রেমের ডালি সাজিয়ে এসেছে, নিরš—র আসছে সেখানে লুৎফার ভাবনার সাথে কিছু মেলে না। ভাবে প্রেম ভালোবাসা কি এত সহজ জিনিস! এতো সহজেই ভালোবাসা যায়! এতো সহজেই পাওয়া যায় কাউকে! এর অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য না বুঝেই প্রেম! ভালোবাসা জিনিসটা শুধু ক্যালকুলেশন আর এ্যডজেস্টমেন্টই তো নয়। সেটা গ্রাজুয়ালি গ্রো করে। ইমোশনাল এ্যাকসেসের একটা ফল আউট আছেই। তাই একসেসকে খুব একটা বিশ্বাস নাই।

৩.

লুৎফার যখন চৌদ্দ বছর বয়স তখন থেকেই সে নিজের সম্পর্কে ধারনা পায়। তাই তার ভুল হয় কম। এই বয়সে মানুষ যে আবেগতাড়িত কাজগুলো করে লুৎফা তা কখনও করেনি। এজন্য লুৎফার বাবা মা তাকে নিয়ে নির্ভার। বরং তারাই লুৎফার কাছে সিদ্ধান্ত পায়। লুৎফা তাৎ¶নিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে। নিজের সম্পর্কে তার ধারনা পরিষ্কার। তার কেনো কনফিউশন নাই। সে কি করবে কোথায় যাবে তার কর্মপদ্ধতি কি হবে সব মোমোটামুটি নির্ধারিত। লুৎফা একজন অধ্যাপকের মতো থিয়োরি দিয়ে জীবন চলাতে ভালোবাসে।

দুপুরের পর রাত এলো। লুৎফা আজ কোথাও গেলো না। সন্ধ্যের পর পরিষ্কার আকাশে মস্ত এক রুপকথার চাঁদ উঠল। এ শহরে খুব একটা রাতের আকাশ দেখা হয় না। আজ দেখছে। বাইরে আজ এক পুকুর জ্যোৎস্না। লুৎফা চুপ করে সেই জ্যোৎস্নায় পা ডুবিয়ে বসল। আজ মনে হচ্ছে কি যেনো একটা ঘটছে ভিতরে। কি যেনো ঘটে  চলেছে! কি সেটা! বুঝতে পারছে নাতো!

অফিসের ছাব্বিশ তলায় বসে কাজে ডুবে ছিল লুৎফা। যখন সে কাজে থাকে তখন দুনিয়ার কোনোকিছু তার মাথায় থাকে না। বেশী কিছু নিয়ে ভেবে ভেবে সে তার মাথাটাকে জ্যাম করতে চায় না। অবসর সময়ে সে দুনিয়ার বাছাই করা বইগুলো পড়ে। সে কখনও লাইব্রেরিতে যায় না। বই পড়ে কিনে। সেটার মধ্যেই আনন্দ। আজ লাঞ্চব্রেকের সময় জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল। কি সুন্দর একটা শহর! ডাউনটাউন টরন্টো। ম্যানহাটনের মতো তেমন দানবীয় মনে হয় না। মনে হয় এটা আমার নিজের শহর। খুব আপন।

আচ্ছা আমার আপন কেউ কি আছে! আপন কেউ কেউ! বাবা মাকে আপন বলা যায়! যায় বোধহয়। কিন্তু বাবা মা কি বোঝে সš—ানকে সবসময়! মনে হয় না। আসলে মানুষ কেউ কাউকে বোঝে না। বাবার সাথে লুৎফা কিছুটা ফ্রি। শেয়ার করতে পারে। সব কি পারে! সব কি পারা যায়! লুৎফার আর কিইবা আছে শেয়ারর করার। ওতো বেশি কিছু শেয়ার করতে চায় না।

সেদিন কি এক প্রসঙ্গে লুৎফার বাবা ওকে  বলছিল,  দিজ আর ডিফিকাল্ট ডেজ। এভরিথিং ইজ কমপ্লিকেটেড, ভেরি কমপ্লিকেটেড।

ঠিক বলছো বাবা।

মানুষের বুদ্ধি যত বাড়ছে ততই লিভিং বিকামস ডিফিকাল্ট।

হু।

সো মাচ কমিউনিকেশনস শ্যাটার দ্য প্রাইভেসি অফ আ পারসন।

বাবা শেষ এই কথাটা কেনো বলল, কে জানে।

বাবা বলল, বুঝলি লুৎফা পুর“ষরা আসলে ম্যাড়া। কিন্তু একটা ভাল মা আর একখান ভাল বউ পেলে ওই ম্যাড়াই তখন সিংহ হয়ে ওঠে। মা কৃ¶, বউ বৃ¶, আর পুরুষ লতা।

তোমার কথা বুঝি না বাবা।

লুৎফার বাবা হাসে হো হো করে।

তুমি কি সুখী বাবা! মাকে বিয়ে করে

সুখী মনেতো হয়রে। তুইকি পুরুষদের ভয় পাস মা!

জানি না বাবা।

লুৎফা পড়া শেষ করেই এই চাকরিটা পেয়ে যায়। বেশ ভালো চাকরি। চাকির নিয়ে সে খুব হ্যাপি। টরন্টো ইউনিভার্সিটি থেকে সে গ্রাজুয়েশন করছে। এখন পড়াশুনাটাকে আপগ্রেড করার চিš—া করছে। পড়াশুনায় সে বরাবর ভালো। স্কুলে যখন সে ইলেভেন গ্রেডে পড়ে তখন থেকেই সে পার্টটাইম কাজ করতো। তাই ভালো একটা চাকরি পেতে তার কেনো অসুবিধাই হয়নি। সে খুব কেরিয়ার নিয়ে চিš—া করে। তার একটা টার্গেট আছে। প্লান আছে। ঠিক এসব বাবতে ভাবতেই ফোনটা এলো। অপ্রত্যাশিতভাবে। ফেনটার দিকে তাকালো লুৎফা।

মনে খুশী ঝরে পড়লো আকস্মিক। তাপসের ফোন। সেদিন ম্যাসেজের উত্তর দেয়ার পর আর যোগযোগ হয় নি। তেমন কোনো তাড়াও ছিল না। হলে হবে না হলে না হবে। কিছু¶ন কথা হলো। কথা বলে ভাল লাগল। তাই যখন তাপস বলল, ফ্রি কিনা লুৎফা এভায়েড করতে পারলো না। তাপসের সাথে দেখা হলে ওরতো খারাপ লাগবে না! তাই বলল অফিসের পর সে ফ্রি আছে। দেখা হতে পারে। লুৎফা এই প্রথম অফিসের পর কারো সাথে দেখা করতে রাজী হয়েছে। আসলে কেউ কখনও সরাসরি বলেইনি দেখা করার কথা। লুৎফা নিজেকে যে খোলসে বন্দী করে রেখেছে সখোনে এ কথা বলার সাহস কেউ দেখায়নি।

বোরোবার সময় নিজেকে একটু দেখে নিল। আজ যে দেখা হবে তাকি আর জানতো! লুৎফাকে যথেষ্ট মানাসই লাগছে। অফিসে সে সবসময় নাইস ড্রেস পড়েই আসে। আয়নায় একটু নিজেকে দেখে নিল। না চেহারায় কোথাও ক্লান্তির ছাপ নেই। বেশ ফ্রেশই লাগছে।

টিম হর্টনে ঢুকেই দুরে তাপসকে দেখল।

৪.

সেদিনের পর কয়েকমাস পার হয়েছে। মাঝে মাঝেই দেখা হয় তাপস আর লুৎফার। দু’জনার মধ্যে একটা সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সম্পর্কটার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা হয়ত নাই তবে বেশ ভালো একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে এটা বলা যায়। দু’জনে দুনিয়ার নানা ব্যাপার নিয়ে কথা বলে। সাহিত্য থেকে শুরু করে কর্পোরেট ওয়াল্ডের্র বিষয় নিয়ে ওদের কথা হয়। লুৎফা সব ব্যাপারেই বেশ চৌকশ। খোঁজ খবর রাখে। তার জ্ঞানের পরিধি বেশ ভালো। সে অনেক দেশ ঘুরেছে। তার বাবাও ঘুরতে খুউব পছন্দ করে। আগে লুৎফাকে সাথে নিয়ে যেতো। এখন লুৎফা একাইে যেতে পারে। সেই তুলনায় মায়ের সাথে লুৎফার তেমন সখ্যতা নাই। 

এখন মে মাস। আজ ওরা অনেকটা দুরে চলে এসেছে। শহর ছাড়িয়ে দুরে। কান্ট্রি সাইটের দিকে। চারিদিকে শুধু বনভূমি আর ফাঁকা জমি। মাইলের পর মাইল। তার মধ্য দিয়ে সরিসৃপের মতো চলে গেছে রা¯—া।  কি একটা উপল¶্যে আজ অফিস বন্ধ।  ছোট্ট এক টাউনে ঢুকে একটা দামী রেষ্টুরেন্টে ওরা বসেছে। দৃশ্যপটের পিছনেই লেক। আদিগন্ত।  লুৎফার যথেষ্ট ¯^াধীনতা আছে। তাকে তেমন কিছু জবাবদিহি করতেও হয়না কারো কাছে।

হঠাৎ লুৎফা বলল, জানো আমার খুউব হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। অথবা মনে হয় খুব গভীর জঙ্গলে গিয়ে সব পোশাক খুলে ফেলে ঘুরে বেড়াই।

তুমি একটু অন্যরকম আছো।

হয়ত। এজন্য মা আমাকে পছন্দ করে না। বাবা করে। বাবা আমকে খুউব বোঝে।

তোমার কি হয়েছে আজকে!

কিছু হয়নাইতো! যেখানে কেউ থাকবে না তেমন জায়গায় গিয়ে সব খুলে ফেলে রোদে হাওয়ায় এলোচুলে বসে থাকি।

তাপস হাসল। লুৎফাকে যতই দেখছে ততই অচেনা লাগছে। কখনও কখনও মনে হয় লুৎফাকে চিনেছে। আবার অচেনা হয়ে যাচ্ছে। কি অদ্ভুৎ কথা বলে মেয়েটা। হয়ত এই পরিবেশ ওকে অন্য রকম ভাবনায় নিয়ে গেছে। শোনো লুৎফা মানুষ ক’দিনই বা বাঁচে! এত পড়াশুনা, ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবাভাবি, কত সময় চলে যায়। তাহলে বাঁচব কখন! কদিন? আয়ুর নাইনটি পারসেন্ট তো চলে যাচ্ছে? দুনিয়াটাকে টেরই পাচ্ছিনা।

তোমার সাথে আমার রিলেশন টিকবে!

টিকবে। তুমি খুউব ভালো লুৎফা।

এটাকে কি ভালো বলা যায়! আমি টিপিক্যিাল মেয়েদের মতো না। ওদের মতো ভাবনা আমার মাথায় আসে না। ধুম ধাম প্রেমে পড়ে যাওয়া, কিসিং, বিছনায় লুটিয়ে পড়া, বিয়ে। তুমি নিশ্চয়ই একসময় ফেডআপ হয়ে যাবা।

না না তা হবোনা।

হু। দেখা যাবে।

বছর গড়িয়েছে। লুৎফা তাপসের সাথে সব কিছু শেয়ার করতে পারে। এটা কম বড় পাওয়া না। মানুষতো কথাই শুনতে চায় না। শুধু বলতে পছন্দ করে। তাপস খুব ভালো শ্রোতা। এজন্য তাপসকে ওর খুব পছন্দ। বস্তুত তাপসকে নিয়ে এর বেশী কিছু ভাবনা ওর মাথায়ই আসেনি। প্রথম প্রথম তাপসের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা ছিল। তাপস প্রকাশ করতো না কিন্তু বোঝা যেতো। মেয়েদের চোখ অনেক কিছু দেখতে পায়। কিন্তু এখন তাপস ওকে বোঝার খুব চেষ্টা করছে। আগের সেই ভাবটা নেই। তাপস এখন খুব শান্ত নদীর মতো। লুৎফার কথা মন দিয়ে শোনে। লুৎফাও ওকে যথেষ্টই গুরুত্ব দেয়। একসময় তাপসের মনে হতো ওদের সম্পর্কটা অসম। এখন আর তা মনে হয় না। মনে হয় লুৎফর একজন ভালো বন্ধু দরকার। লুৎফার উপর যথেষ্ট আস্থা আছে তাপসের। সে ঠিক সঠিক মানুষ চিনতে পারবে। তার ইমাজিনেশন খুব শক্তিশালী।

আচ্ছা বলোতো তোমার সাথে আমার সম্পর্কটার কি নাম!

বলব!

বল।

একটু চিন্তা করে তাপস বলল, বলতে পারবো না।

লুৎফা হেসে বলল আমি জানতাম তুমি পারবা না। আসলে সম্পর্কের কেনো নাম থাকে না। পৃথিবীতে কোন কিছুই স্থায়ী না। সম্পর্কও স্থায়ী না। সবকিছু বদলাতে থাকে।

তাতো ঠিকই। তারপরতো মানুষ সম্পর্ক তৈরী করে। টিকিয়ে রাখার জন্যই করে।

কিন্তু টিকে থাকলেও সেটাকে সম্পর্ক বলা যায় না। কত ¯^ামী স্ত্রী একসাথে থাকেই শুধূ কিন্তু কোনো সম্পর্ক রচিত হয় না। আমার বাবাকেও দেখেছি। বাবা আমার মাকে হয়ত ভালবাসে কিন্তু মা কি বাবাকে বোঝে! এ ব্যপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

তোমাকে আমার ভাল লাগে লুৎফা।

সেটা তো আমি জানি।

আমাকে তোমার কেমন মানুষ মনে হয়!

তোমার সাথে কথা বলে আমার আনন্দ হয়। তুমি কথা শেনো। কিন্তু তুমি তোমাকে নিয়ে কনফিউজড।

তুমি কিভাবে জানো!

আমি জানি।